ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

রূপপুরে প্রথমবার সফল হয়েছে পারমাণবিক বিক্রিয়া

দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে শুরু হওয়া পারমাণবিক বিক্রিয়া সফল হয়েছে। রবিবার  বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।


তিনি জানান, রবিবার দুপুর ৩টা ৩৪ মিনিটে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় পর্যন্ত চুল্লির সব প্যারামিটার নির্ধারিত মাত্রায় ছিল। পাশাপাশি বিকিরণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে নিশ্চিত করেন তিনি।


এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ মডেলের পারমাণবিক চুল্লি। আধুনিক এই প্রযুক্তিতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে ‘বি-১’ পর্যায়ের কার্যক্রম মোটামুটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের পরীক্ষায় দেখা দেওয়া জটিলতাও কাটিয়ে ওঠা হয়েছে। এরপর শুরু হয় ‘বি-২’ পর্যায়ের কার্যক্রম, যেখানে প্রাথমিক পরিচালনার জন্য পারমাণবিক চুল্লিকে প্রস্তুত করা হয়।


এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘ক্রিটিক্যালিটি’ বা চুল্লিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করা। এর মাধ্যমে চুল্লির ভেতরে নিয়ন্ত্রিতভাবে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া চালু হয়। পরবর্তী ধাপগুলোতে বিভিন্ন পরীক্ষা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে।


প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতিতে বড় পদক্ষেপ।


ড. জায়েদুল হাসান জানান, এ অর্জনের ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সংযুক্ত হওয়ার (গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন) পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে অনুমোদিত কমিশনিং কর্মসূচি অনুযায়ী রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স পরীক্ষা, বিভিন্ন সিস্টেম ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই, ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রিড সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।


এনপিসিবিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকৌশলী, অপারেশন ও কমিশনিং বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সহযোগিতায় এই পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।



রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি অর্জন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি দেশের বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও পারমাণবিক প্রযুক্তি সক্ষমতার বিকাশে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমের পর বাংলাদেশ এখন প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।


প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্রিটিক্যালিটি অর্জন থেকে শুরু করে গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন এবং পরবর্তী ধাপগুলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তামান, অনুমোদিত কারিগরি পদ্ধতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হবে।


রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ক্রিটিক্যালিটি অর্জন এনপিসিবিএলের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর আগে কমিশনিংয়ের পরবর্তী ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে।


সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটে উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে প্রথম পারমাণবিক বিক্রিয়া সফল হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

ads
ads
ads

Our Facebook Page

↑